ঔপনিবেশিক শাসন আমলে বাংলায় সাম্প্রদায়িকতার উদ্ভব ও বিকাশ আলোচনা কর।

ঔপনিবেশিক শাসন আমলে বাংলায় সাম্প্রদায়িকতার উদ্ভব ও বিকাশ আলোচনা কর।

বাংলায় সাম্প্রদায়িকতার উদ্ভব ও বিকাশ মূলত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের ফসল। Divide and Rule নীতি এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যকে কাজে লাগিয়ে শাসকগোষ্ঠী ধর্মীয় বিভেদকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। এর ফলে হিন্দু ও মুসলিম সমাজের মধ্যে অবিশ্বাস ও দূরত্ব সৃষ্টি হয়।

সাম্প্রদায়িকতার উদ্ভব ও বিকাশ-এর ঐতিহাসিক পটভূমি

ব্রিটিশরা তাদের শাসনকে দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য বাংলায় সাম্প্রদায়িকতার উদ্ভব ও বিকাশ-এর বীজ বপন করে। পলাশীর যুদ্ধের পর থেকেই অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে উভয় সম্প্রদায়ের অবস্থানের তারতম্য এই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে।

১. ঔপনিবেশিক নীতির প্রভাব: বিভেদ সৃষ্টির সূত্রপাত

১.১. চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফল

১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বাংলায় সাম্প্রদায়িকতার উদ্ভব ও বিকাশ-এর প্রথম ধাপ তৈরি করে।

  • হিন্দু জমিদার শ্রেণির উত্থান: এই বন্দোবস্তের ফলে জমির স্থায়ী মালিকানা মূলত স্থানীয় হিন্দু জমিদারদের হাতে চলে আসে।
  • মুসলিম কৃষক ও প্রজাদের শোষণ: অন্যদিকে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সম্প্রদায় পরিণত হয় জমিদারদের শোষিত প্রজা শ্রেণিতে। এই অর্থনৈতিক বৈষম্যই ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ক্ষোভের জন্ম দেয়।

১.২. সরকারি চাকরিতে বৈষম্য

  • শুরুতে ফারসি ভাষা তুলে দিয়ে ইংরেজি ভাষা চালু হওয়ার ফলে মুসলিম অভিজাত শ্রেণি সরকারি চাকরি থেকে পিছিয়ে পড়ে।
  • শিক্ষাক্ষেত্রে এগিয়ে থাকায় হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণি দ্রুত সরকারি চাকরিতে ও বিভিন্ন পেশায় স্থান করে নেয়। এই প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য সাম্প্রদায়িকতার উদ্ভব ও বিকাশ-এর ক্ষেত্র প্রস্তুত করে।

২. ধর্মীয় ও সংস্কার আন্দোলন: স্বাতন্ত্র্যবোধের জন্ম

২.১. মুসলিম সংস্কার আন্দোলন

ফরায়েজী আন্দোলন এবং তিতুমীরের আন্দোলন ছিল মূলত ধর্মীয় শুদ্ধিকরণের জন্য শুরু হলেও, এদের লক্ষ্য ছিল জমিদার ও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে কৃষক ও দরিদ্র মুসলিমদের সংগঠিত করা।

  • এই আন্দোলনগুলো মুসলিমদের মধ্যে একটি স্বতন্ত্র ধর্মীয় ও সামাজিক পরিচয়কে শক্তিশালী করে, যা সাম্প্রদায়িকতার উদ্ভব ও বিকাশ-এর ক্ষেত্রে এক নতুন মাত্রা যোগ করে।

২.২. হিন্দু পুনর্জাগরণ

ব্রাহ্মসমাজ এবং আর্য সমাজের মতো সংস্কার আন্দোলনগুলি একদিকে যেমন সমাজের কুসংস্কার দূর করে, তেমনি কিছু ক্ষেত্রে হিন্দু জাতীয়তাবাদী চেতনাকেও শক্তিশালী করে তোলে, যা অপর সম্প্রদায়ের মধ্যে সন্দেহের জন্ম দেয়।

৩. ইংরেজদের প্রত্যক্ষ বিভেদ নীতি (‘Divide and Rule’)

৩.১. বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫)

লর্ড কার্জন প্রশাসনিক অজুহাতে বাংলাকে বিভক্ত করেন।

  • রাজনৈতিক বিভাজন: এই বিভাজনের ফলে পূর্ববঙ্গে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠদের জন্য একটি নতুন প্রদেশ গঠিত হয়, যা মুসলিমদের মধ্যে আর্থিক ও রাজনৈতিক সুবিধা লাভের আশা জাগায়।
  • হিন্দু জাতীয়তাবাদ: অন্যদিকে, হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা এটিকে অখণ্ড বাংলার ওপর আঘাত হিসেবে দেখে তীব্র আন্দোলন শুরু করে। এই ঘটনা বাংলায় সাম্প্রদায়িকতার উদ্ভব ও বিকাশ-কে এক চরম পর্যায়ে নিয়ে যায়।

৩.২. পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা (১৯০৯)

মর্লে-মিন্টো সংস্কার আইন-এর মাধ্যমে মুসলিমদের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা চালু করা হয়।

  • এই ব্যবস্থার ফলে হিন্দু ও মুসলিম প্রার্থীরা শুধুমাত্র নিজ নিজ সম্প্রদায়ের ভোটারদের ভোটেই নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ পান।
  • এটি দুই সম্প্রদায়ের নেতাদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক প্রচেষ্টার পরিবর্তে সাম্প্রদায়িক স্বার্থ রক্ষার প্রবণতা তৈরি করে, যা সাম্প্রদায়িকতার উদ্ভব ও বিকাশ-এর সবচেয়ে বড় কারণগুলির মধ্যে একটি।

৪. সাম্প্রদায়িকতার রাজনৈতিক রূপায়ণ

৪.১. মুসলিম লীগ ও হিন্দু মহাসভার প্রতিষ্ঠা

  • ১৯০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত মুসলিম লীগ এবং ১৯১৫ সালে গঠিত হিন্দু মহাসভা যথাক্রমে মুসলিম ও হিন্দু সমাজের রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার দাবি করে।
  • এই দলগুলির উত্থান প্রমাণ করে যে, সাম্প্রদায়িকতার উদ্ভব ও বিকাশ এখন কেবল সামাজিক বা অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক রূপ নিয়েছে।

৪.২. অসহযোগ আন্দোলন ও খিলাফত আন্দোলনের সমন্বয়

খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের সময় হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে অভূতপূর্ব ঐক্য দেখা গেলেও, এই ঐক্য ছিল সাময়িক এবং ধর্মীয় আবেগনির্ভর, যার স্থায়ী রাজনৈতিক ভিত্তি ছিল দুর্বল। আন্দোলন প্রত্যাহারের পর দ্রুতই এই ঐক্য ভেঙে যায়।

৫. সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও বিভাজন প্রক্রিয়া

৫.১. ১৯৪৬ সালের গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং

১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্টের প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবসকে কেন্দ্র করে কলকাতায় যে ভয়াবহ দাঙ্গা শুরু হয়, তা ছিল সাম্প্রদায়িকতার উদ্ভব ও বিকাশ-এর চূড়ান্ত ও রক্তাক্ত ফল।

  • এই দাঙ্গা দুই সম্প্রদায়ের মধ্যেকার সম্পর্ককে স্থায়ীভাবে বিষিয়ে তোলে এবং দেশভাগকে অনিবার্য করে তোলে।

৫.২. দেশভাগ (১৯৪৭)

অবিভক্ত বাংলার নেতারা শেষ পর্যন্ত সাম্প্রদায়িকতার এই চরম পরিণতি থেকে মুক্ত হতে পারেননি। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ ছিল ঔপনিবেশিক আমলে বাংলায় সাম্প্রদায়িকতার উদ্ভব ও বিকাশ-এর চূড়ান্ত সমাপ্তি, যেখানে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বাংলা দুই ভাগে বিভক্ত হয়।


উপসংহার

ঔপনিবেশিক আমলে সাম্প্রদায়িকতার উদ্ভব ও বিকাশ ছিল শাসকগোষ্ঠীর স্বার্থ এবং বাঙালি সমাজের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ত্রুটিগুলির সম্মিলিত ফল। ব্রিটিশরা বিভেদের নীতি অনুসরণ করে এই বিভেদকে এমনভাবে কাজে লাগিয়েছিল যে, শেষ পর্যন্ত তা একটি রক্তাক্ত দেশভাগে পর্যবসিত হয়।

উত্তরসহ ডিগ্রি স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস সাজেশন pdf

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *